ঢাকায় বিনা চিকিৎসায় পুর্তগালপ্রবাসীর মৃ’ত্যু : ভাইয়ের আ’বেগঘন স্ট্যাটাস

ঢাকায় বিনা চিৎিসায় ছোট ভাইয়ের মৃ’ত্যু হয়েছে এমন অ’ভিযোগ করে ফেসবুকে আ’বেকঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন পর্তুগালের লিসবন সিটি কাউন্সিলর রানা তাসলিম উদ্দিন। দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে পর্তুগাল প্রবাসী রানা তাসলিম উদ্দিন সে দেশের ক্ষ’মতাসীন দলের লিসবনের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি ও তার স্ত্রী বাংলাদেশে আসেন। স্ত্রী কয়েক দিন থেকে চলে গেলেও রয়ে যান রানা তাসলিম উদ্দিন।

এরই মধ্যে করোনাভা’ইরাসের বিস্তৃতি বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়লে আ’টকে পড়েন রানা তাসলিম উদ্দিন। জানা যায়, গত ২৫ মার্চ রাতে রানা তাসলিম উদ্দিনের ছোট ভাই পুরান ঢাকার বাসিন্দা সফিকউদ্দিন ভুট্টো (শ্বাসক’ষ্ট জনিত রো’গী) খুব বেশি অ’সুস্থ হয়ে পড়লে কোনো হাসপাতালে তার চিকিৎসা না করায় মৃ’ত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। রানা তাসলিম তখন ঢাকাতেই ছিলেন। ছোট ভাইকে দা’ফন করে ফিরে গেছেন লিসবনে। সেখান থেকেই বুধবার মধ্যরাতে ফেসবুকে আ’বেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন রানা তাসলিম উদ্দিন। তার স্ট্যাটাসটি হুবহু দেয়া হলো- ‘বিশাল অ্যাটল্যান্টিক সাগরের দিকে তাকিয়ে যেমনি কোন কূল কিনারা দেখা যায় না তেমনি আজ

জীবন মৃ’ত্যুর স’ন্ধিক্ষনে দাঁড়িয়ে ব্যাক্তিগত ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মূল্যবান এই জীবনকে তু’চ্চ একটি পাখির মতই মনে হয়। মনে হয় দেহ খাঁচা থেকে প্রান পাখিটা উড়ে গেলেই সব শেষ! বিশ্ব পরিস্থিতির এই ক্রা’ন্তিলগ্নে প্রায় দেড় মাস পর্তুগালে আমি অনুপস্থিত ছিলাম। প্রিয় দেশ মাটি ভাষা আর পরিবারের সান্নিধ্য পাবার আশায় প্রতি বছর ছুটে যাই শিকড়ের টানে, প্রিয় মাতৃভূমিতে, আমার প্রিয় বাংলাদেশে। এবারও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। এবার বাংলাদেশে যেয়ে নতুন এক অভিজ্ঞতার সঞ্চার হোল। মনে হোল আকাশ আর জমিনের মাঝখানে আমি এক ঝুলন্ত প্রাণী। একদিকে পর্তুগালে আমার প্রানের পরিবার আর অন্য দিকে আমার আমার বৃদ্ধ মা জননী আর পরিবারবর্গ। বিশ্বের এই চরম বি’পর্জয়ে এয়ারলাইন্স সমুহ ব’ন্ধের কারনে বৈশ্বিক যোগাযোগ ব’ন্ধ হয়ে হয়ে গেলে আমার পর্তুগালে ফিরে আসা অ’নিশ্চিত হয়ে পড়ে।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ল’কডাউন শুরু হয়ে যায় আর আমরা প্রবাসীরা ভীষণ চাপের মধ্যে দিনকাল অ’তিবাহিত করি। ফিরে আসার ব্যত্যয়ে নতুন ফ্লাইট খোঁজায় যখন দিনাতিপাত করি এরই মাঝে হোল ম’রার উপর খাঁড়ার ঘা। হঠাত করেই অতি আদরের ছোট ভাই সফিক উদ্দিন ভুট্টোর হাঁপানি রো’গটি চরম আকার ধারন করে শ্বা’সকষ্ট শুরু হয়। কভিড ১৯ করোনার আ’তংকে বাংলাদেশে কোন হাসপাতাল তাকে ভর্তি করতে চায়নি বলে সে অকালে ৪৪ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে, এই পৃথিবীর মায়া ত্যা’গ করে, চারটি নাবালক ছেলেমেয়ে, স্ত্রী, মা, ভাই, আত্মীয় স্বজন ও অসংখ্য বন্ধু বান্ধব রেখে পরপারে পাড়ি দেয়! যে ভাইটিকে আমি ছোট বেলা থেকে কোলেপিঠে মানুষ করে ১৯৯৫ তে পর্তুগালে নিয়ে এসেছিলাম, ২০টি বছর আমার কাছে আগলে রেখেছিলাম সে আজ আমার সামনে বি’না চিকিৎসায় চলে গেল আর আমি তাকে নিজ হাতে দাফন করলাম। এর চেয়ে হৃদয় বি’দারক ঘটনা আমার জন্য আর কিই বা হতে পারে! ২০ বছর পর্তুগালে থাকার পর ২০১৫ সালে একদিন আমাকে বললো, সে আর পর্তুগালে থাকবেনা, তার ছেলেমেয়েদেরকেও এখানে আনবেনা। বিদেশ নাকি তার কাছে পর পর মনে হয়। বাকী জীবনটা দেশের মাটিতেই

কা’টাতে চায়। আমি ও আমার স্ত্রী তাকে বেশ বুঝানোর পরেও আমাদের কথা শুনল না। ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে আমিই তাকে লিসবন এয়ারপোর্টে তুলে দিয়ে আসি। সেদিনটিও আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। কারন ঢাকা থেকে ইউরোপে আসার সময় আমিই তাকে রয়েল ডাচ এয়ারে ১৯৯৫ সালে তুলে দিয়েছিলাম। আজ আমার কাছে সব কিছুই স্বপ্নের মতই মনে হচ্ছে। পর পর তিনবার তাকে আমি বি’দায় দেই আর এবার ছিল শেষ বি’দায়! এই বি’দায়কে আমি কিছুতেই মানতে পারছিনা! ওর কথা মনে হলে আমার বুকের ভিতর কেমন করে সব দুমড়ে মুচড়ে উঠে তা আমি কাউকে বলতে পারিনা। অতীতের স্মৃতি গুলো সিনেমার পর্দার মতো চোখের সামনে ভেসে উঠে। আমার পরে আমার আরেক ভাই আছে। তারপর আমার এই ভাই ভুট্টো। আমার ১০ বছরের ছোট হয়ে কেমন করে আমাদের ফেলে চলে গেল তা একমাত্র রহমানুর রহীমই জানেন। আমাদের সবাইকে যেতেই হবে তবে কিছু কিছু যাওয়া এমনই ম’র্মান্তিক হয় তা মেনে নেয়া খুব দু’স্কর! আমার দেশ বিদেশের লাখো শু’ভাকাঙ্ক্ষীদের, আত্মীয় পরিজনদের সবার প্রতি আমার আকুল আবেদন, আমার এই ভাইটির জন্য আপনারা প্রান ভরে দোয়া করবেন। যাতে মহান রাব্বুল আলামিন তাকে জান্নাতবাসী করেন। আমার জন্যও আমি দোয়া প্রার্থী যাতে মহান রব আমাকে এই

শো’ক সইবার শক্তি দেন আর তার এতিম এই নাবালক বাচ্চাদের খেয়াল রাখার তৌফিক দান করেন। আমার ভাই একজন সাধারন মানুষ ছিল। তার এতো গণসংযোগ ছিলোনা। তারপরও হাজার হাজার মানুষ তাকে নিয়ে ফেইসবুকে লিখেছেন, কমেন্ট করেছেন, তার জন্য দোয়া করেছেন, আমাকে ফোনে, মেসেজে সান্তনা দিয়েছেন। আমি মানসিক অবস্থার কারনে আপনাদের কিছু বলতে বা লিখতে পারিনি। তবে আপনাদের জন্য আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে অনেক অনেক আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও দোয়া রইলো। মহান রাব্বুল আলামিন পৃথিবীর এই দুঃসময়ে, এই দু’রবস্থায়, এই বি’পর্যয়ে সবাইকে হেফাজত করুক, পরিবার পরিজন নিয়ে শান্তিতে রাখুক, জগতের এই মহামারী দূ’রীভূত হোক, মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের দরবারে এই দোয়া ও কামনা করি। আ’ল্লাহ্ আমাদের সবার সহায় হোন, আমীন! জানা যায়, গত ২৫ মার্চ রাতে রানা তাসলিম উদ্দিনের ছোট ভাই সফিকউদ্দিন ভুট্টো (শ্বাসক’ষ্ট জনিত রো’গী) বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু, শ্বাসক’ষ্ট থাকায় চিকিৎসকরা করোনা স’ন্দেহ করে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে রেফার করেন। তিন ঘণ্টা হাসপাতালের গেটে অ’পেক্ষার পর তাকে সেখানকার চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেন যে, সে করোনাভা’ইরাসে আ’ক্রান্ত নয়। তাই অন্য যেকোনো হাসপাতালে চলে যেতে বলেন তারা। এরপর গভীর রাতে হাসপাতাল-হাসপাতাল ঘুরে কোথাও ভর্তির সু’যোগ পায়নি সে। সব হাসপাতালই করোনা স’ন্দেহে তাকে ভর্তি করাতে অ’স্বীকৃতি জানায়। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের মতামত জানিয়েও কোথাও তাকে ভর্তি করানো যায়নি। শেষ পর্যন্ত মৃ’ত্যুর কোলেই ঢলে পড়তে হয় তাকে।