নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে শুক্রবার ‘শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের’ দাবিদার অস্ট্রেলীয় যুবকের রাইফেলের নির্বিচার গুলিতে আরো তিন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে তাদের পারিবারিক সূত্র। রবিবার নিউজিল্যান্ডে যোগাযোগ করেও ওই ঘটনায় তাদের নিহত হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এরা হলেন, মতলবের ডা. মোজাম্মেল হোসেন সেলিম (৩০), নরসিংদীর পলাশ উপজেলার জাকারিয়া ভূঁইয়া (৩৪) ও নারায়ণগঞ্জের ওমর ফারুক (৩৫)। এ নিয়ে হামলার ঘটনায় নিহত বাংলাদেশিদের সংখ্যা দাঁড়াল পাঁচ। এটা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এর আগে শুক্রবার বাংলাদেশের অনারারি কনসাল শফিকুর রহমানের মাধ্যমে কুড়িগ্রামের ড. আবদুস সামাদ, সিলেটের হোসনে আরা পারভীনের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। নিহতদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। ক্রাইস্টচার্চে যোগাযোগ করে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের ড. আবদুস সামাদ, সিলেটের হোসনে আরা পারভীনের লাশ সেখানেই দাফন করা হবে। বাকী তিনজনের লাশ দেশে আনা হবে।

 

 

 

 

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ইত্তেফাককে জানান, ক্রাইস্টচার্চে দুই মসজিদে হামলায় নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ হস্তান্তরের জন্য পরিবারের একজন সদস্যকে সেখানে নেবে নিউজিল্যান্ড সরকার। রবিবার নিউজিল্যান্ড সরকারের তরফ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। যারা বাংলাদেশ থেকে যাবেন, তারা স্বজনের মরদেহ নিয়ে দেশে ফিরতে পারবেন। ময়নাতদন্ত ও পরিচয় শনাক্ত করার কাজ শেষে শীঘ্রই মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর শুরু হবে বলে জানিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা অ’ডুর্ন।

মতলব দক্ষিণ (চাঁদপুর) সংবাদদাতা জানান, নিহত ডা. মোজাম্মেল হোসেন সেলিমের (৩০) বাড়ি চাঁদপুরের দক্ষিণ উপজেলার হুরমহিষা গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের মৃত হাবিবউল্লাহ মিয়াজীর ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মোজাম্মেল হোসেন সেলিম দন্ত চিকিৎসক হিসেবে পাস করার পর ২০১৫ সালে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য নিউজিল্যান্ডে যান। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। শুক্রবারের ওই হামলার ঘটনার পর থেকে তার মোবাইলে ফোন দিয়ে সংযোগ পাওয়া যায়নি। পরে ১৬ মার্চ বিকালে নিউজিল্যান্ডে বসবাসকারী কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার মুজিবুর নামের এক সহপাঠী ফোন করে তার মৃত্যুর খবর জানান। সেলিমের মৃত্যুতে তার বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। তার বৃদ্ধা মা জামিলা খাতুন সন্তানকে হারিয়ে পাগল প্রায়। ভাই-বোন ও স্বজনদের আহাজারিতে বাড়ির বাতাস ভারি হয়ে আছে। সেলিমের ভাই শাহদাত হোসেন বলেন, আমাদের এক বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে সেলিম সবার ছোট। সরকারের কাছে একটি চাওয়া দ্রুত যেন আমার ভাইয়ের লাশ দেশে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে।

 

 

 

পলাশ (নরসিংদী) সংবাদদাতা জানান, ক্রাইস্টচার্চ নিহত জাকারিয়া ভূঁইয়ার (৩৪) বাড়ি নরসিংদীর পলাশ উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের জয়পুরা গ্রামে। বাবার নাম আব্দুল বাতেন ভূঁইয়া। ঘটনার সময় তিনি জুমার নামাজ পড়তে আল নূর মসজিদে গিয়ে ছিলেন। বন্দুকধারীর হামলায় নিহত হওয়ার খবর পরিবারের কাছে পৌঁছালে পুরো পরিবার শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো গ্রাম জুড়ে। নরসিংদীর পলাশ উপজেলার জাকারিয়া ভূঁইয়া ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। মসজিদ থেকে যখন লাশ হাসপাতালের মর্গে আনার পর সেখানে তার এক বন্ধু তাকে সনাক্ত করেন। জানা যায়, নিহত জাকারিয়া প্রায় আড়াই বছর আগে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরে পাড়ি দেন। সেখানে তিনি একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের ওয়েল্ডার টেকনিশিয়ান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর আগে তিনি দীর্ঘ ৮ বছর সিঙ্গাপুরে কর্মরত ছিলেন।

জাকারিয়ার মা শাহানারা বেগম ও তার স্ত্রী রিনা আক্তার শোক সইতে না পেরে কিছুক্ষণ পরপরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। তার বাবা আব্দুল বাতেন ভূঁইয়া জানান, শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ে বাড়ি আসার পথে নিউজিল্যান্ড থেকে জাকারিয়ার এক সহকর্মী ফোন করে জানায়, সেখানের এক মসজিদে গোলাগুলি হয়েছে। এতে জাকারিয়া গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। এর কিছুক্ষণ পরে আবার খবর আসে জাকারিয়া আর নেই। এখন আমরা তার লাশের অপেক্ষায় রয়েছি।

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বন্দুকধারীর হামলার পর থেকে নিখোঁজ থাকা নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার ওমর ফারুক (৩৫) মারা গেছেন বলে জানতে পেরেছেন পরিবারের সদস্যরা। সেখানে থাকা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ওমর ফারুকের পরিবার এ খবর পেলেও এখনো আনুষ্ঠানিক কোন তথ্য তাদের কাছে আসেনি। নিউজিল্যান্ডে থাকা বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি প্রবাসী এ বিষয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দিয়েছেন।

 

 

 

 

ওমর ফারুকের ভগ্নীপতি সারোয়ার হোসেন জানান, শনিবার সন্ধ্যায় তারা নিউজিল্যান্ড হতে ওমর ফারুকের সঙ্গে থাকা রুমমেট ও অন্যদের কাছ থেকে মৃত্যুর খবর পেয়েছেন। নিখোঁজ ওমর ফারুকের স্ত্রী সানজিদা জামান নিহা জানান, ফারুকের সঙ্গে ২০১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর তার বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন পর তিন নিউজিল্যান্ড চলে যায়। পরে গত বছরের ১৬ নভেম্বর ছুটিতে দেশে আসেন। চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি পুনরায় নিউজিল্যান্ড চলে যান। নিহা বর্তমানে ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সূত্র ইত্তেফাক