সে আমার খুব আদরের বোন ছিল। তার সাথে আর দেখা হবে না, কথা হবে না। আর আমায় ভাই বলে ডাকবে না। প্রতিদিন আর কেউ ফোন করে খবর নিবে না। কান্না জড়িত কন্ঠে কথাগুলো বলছিলেন নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হোসনে আরা পারভীনের বড় ভাই নাজিম উদ্দিন।

শনিবার সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালহাটা গ্রামের নিহত হোসনে আরা পারভীনের বাবার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আচমকা এই দুঃসংবাদে পরিবারের সকলেই শোকাহত। স্বজনদের সকলেই কান্না করছেন। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শি ও গণমাধ্যমকর্মীরাও ভিড় করছেন এই বাড়িতে।

নিহত হোসনে আরা উপজেলার জাঙ্গালহাটা গ্রামের মরহুম নুর উদ্দিনের মেয়ে। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, হুসনে আরা পারভীনের লাশ নিউজিল্যান্ডের একটি হাসপাতালে রাখা রয়েছে। তবে বর্তমানে সেখানে বসবাসরত পারভীনের স্বামী ও মেয়ের সাথে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি পরিবারের। ফলে লাশ দেশে আসবে না সেখানেই দাফন হবে তা নিশ্চিত নন গ্রামের বাড়ির লোকেরা।

পরিবারের একাধিক সদস্য জানান, এক বছর আগে হুসনে আরা পারভীনের ভাই বুরহান উদ্দিন নিউজিল্যান্ডে মারা গেলে সেখানেই দাফন করা হয়। হুসনে আরা পারভীনকেও সেখানেই দাফন করা হতে পারে।

২ভাই ও ৩বোনের মধ্যে সবার ছোট হুসনে আরা পারভীন। ১৯৯২ সালে বিশ্বনাথ উপজেলার ১নং মিরেরচর গ্রামের মৃত মকররম আলীর পুত্র ফরিদ উদ্দিনের বিয়ে হয় তার। তিনি ১৯৯৪ সালে স্বামীর সাথে নিউজিল্যান্ডে পাড়ী জমান। দাম্পত্য জীবনে শিপা আহমেদ (১৭) নামের একজন কন্যা সন্তানের জননী তিনি।

এদিকে, হুসনে আরা পারভীনের মৃত্যুতে অসহায় হয়ে পড়েছেন তাঁর পঙ্গু স্বামী ফরিদ উদ্দিন (৫৫) ও একমাত্র কন্যা শিফা বেগম।

বিশ্বনাথে গ্রামের বাড়িতে থাকা ফরিদ উদ্দিনের ভাতিজা নজরুল ইসলাম জানান, নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত অবস্থায় প্রায় ১৫বছর পূর্বে চাচা ফরিদ উদ্দিনের সড়ক দুর্ঘটনায় দুই পা পঙ্গু হয়ে যায়। পঙ্গু হওয়ার পর হুইল চেয়ারে করে তাকে দেখাশুনা করতেন স্ত্রী পারভীন। তিনি অসুস্থতার কারণে ১৫বছর ধরে দেশের বাড়িতে আসতে পারেন নি। পারভীনও স্বামীকে অসুস্থ রেখে দেশের বাড়িতে তেমন আসা যাওয়া ছিলো না। পারভীন সর্বশেষ ২০০৯সালে তার একমাত্র কন্যা শিপা বেগমকে সাথে নিয়ে দেশে আসেন। মাত্র ১০দিন দেশে অবস্থান করে স্বামীর টানে আবার নিউজিল্যান্ডে চলে যান।

সন্তান আর স্বামীকে দেখাশুনায় দিন কাটতো পারভীনের। শুক্রবার জুম্মার নামাজ আদায় করতে স্বামীকে হুইল চেয়ারে করে সাথে নিয়ে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদের ভেতরে রেখে তিনি তিনি মহিলা অংশে নামাজ পড়তে যান। এসময় তিনি মসজিদের ভেতরে গুলির শব্দ পেয়ে স্বামীকে বাঁচাতে এগিয়ে যান। কিন্তু তার স্বামী বেঁচে গেলেও ওই সন্ত্রসীর গুলিতে পারভীন ঘটনা স্থলেই নিতহ হন। তার এই অকাল মৃত্যুতে অসহায় হয়ে পড়লেন পঙ্গু স্বামী আর একমাত্র কন্যা সন্তান শিফা বেগম।

তার মৃত্যুর খবরে মিরেরচর গ্রামেও দেখা দিয়েছে শোকের আবহ। শনিবার পারভীনের শশুড় বাড়িতে শিরনী করে গরীব অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।