বহুল প্রতীক্ষিত ডাকসু নির্বাচনের অনিয়মের ঘটনাগুলো আমাদের খুবই লজ্জিত করেছে। এই ঘটনা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে বিনষ্ট করেছে। এতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সম্পর্কে অবনতি ঘটেছে, যা সার্বিকভাবে একাডেমিক পরিবেশ বিঘ্নিত করবে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ শেষে সোমবার স্বেচ্ছাসেবী পর্যবেক্ষক দল এক বিবৃতি এই কথা জানিয়েছে।

ওই পর্যবেক্ষক দলে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাহমিনা খানম ও অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অতনু রব্বানী।

তাঁদের স্বাক্ষর করা বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এত বছর পর অনুষ্ঠিত এই ডাকসু নির্বাচন সফলভাবে না করতে পারার ব্যর্থতার দায়ভার প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষক এবং সমগ্র শিক্ষক সম্প্রদায়ের নৈতিকতার মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আমরা চাই এই ব্যর্থতার একটি সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা হোক। সে সঙ্গে এই নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করে অবিলম্বে নতুন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হোক।
বিবৃতিতে পর্যবেক্ষকেরা বলেন, ব্যালট পেপারে কোনো সিরিয়াল নম্বর ছিল না। ৪৩ হাজার ভোটারের একটি নির্বাচনের ব্যালট পেপারে সিরিয়াল নম্বর না থাকাটা আমাদের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। কারণ, এতে নির্বাচনের ফলাফলে গুরুতর অনিয়ম ঘটানো অনেক সহজ হয়ে যায়।

 

 

পর্যবেক্ষকেরা জানান, ছাত্রদের হলের ভেতর মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। তবে ভোটকেন্দ্রের বাইরে কতগুলো অনিয়ম চোখে পড়ে (ক). ভোটারের আইডি চেক করার ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের সদস্যরাই বেশি মাত্রায় ভূমিকা রেখেছেন এবং অনাবাসিক ছাত্রদের ভোট দিতে বাধা দেন ও নিরুৎসাহিত করেন। (খ). ছাত্রলীগের কর্মীরা নির্বিঘ্নে চলাফেরা করলেও, অন্য প্যানেলের প্রার্থী ও কর্মীরা ভোটকেন্দ্রের বাইরে বা ভোটারের সারির আশপাশে অবস্থান গ্রহণ করতে বাধাগ্রস্ত হয়েছেন। (গ). ভোটকেন্দ্রের বাইরে কৃত্রিম জটলা করে রেখেছেন ছাত্রলীগের কর্মীরা, যাতে ভোট গ্রহণপ্রক্রিয়া শ্লথ হয় এবং বাকিরা ভোটদানে নিরুৎসাহিত হন। (ঘ). অনেক ক্ষেত্রে বুথের ভেতর আমরা সময় গণনা করে দেখেছি ৫ থেকে ২৩ মিনিট পর্যন্ত সময় ব্যয় করেছেন। (ঙ). ভোট চলাকালেই রোকেয়া হলের সামনে একটি সংগঠনের ২০–২৫ জন কর্মীকে হর্ন বাজিয়ে শোডাউন করতে দেখা গেছে, যা আচরণবিধির লঙ্ঘন।ওই পর্যবেক্ষক দল ছাত্রদের এস এম হল, সূর্য সেন হল, মুহসীন হল, এফ রহমান হল, শহীদুল্লাহ্ হল এবং ছাত্রীদের রোকেয়া হল ও কুয়েত–মৈত্রী হল পরিদর্শন করে।

 

ডাকসু নির্বাচনে ভোট দিয়ে শিক্ষার্থীরা ইতিহাসের অংশ হতে চেয়েছিল; হয়ে গেলেন কলঙ্কিত নির্বাচনের স্বাক্ষী। দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত বহুল প্রতিক্ষিত এই নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ভতির্, লাগামহীন জালভোট, ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির ঘটনায় বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।

জাল ভোট প্রদান, সিলযুক্ত ব্যাটল বাক্স উদ্ধার, ভোট দানে বাঁধা, প্রার্থীদের মারধরসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ ছাড়া সব প্যানেলের প্রার্থীরা নির্বাচন বর্জন করেছে। তারা ক্যাম্পাস জুড়ে বিক্ষোভ করে ভিসির বাসা ঘেড়াও করে রেখেছে। নির্বাচন বাতিল করে পুনঃতফসিল ঘোষণা না করা পর্যন্ত অবস্থান এবং ধর্মঘট কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দিয়েছে।

এর আগে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয় নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্ব ছাত্রদল। তারও আগে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বাম সংগঠনগুলোর জোট প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্লাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ, ছাত্র ফেডারেশন ও স্বতন্ত্র জোট। তারা দাবি ভোট কারচুপির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তবে ছাত্রলীগ সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে পরাজয় নিশ্চিত বুঝে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই স্বার্থন্বেষী মহল এমন অভিযোগ তুলছে। নতুন করে নির্বাচনের দাবি হাস্যকর।

তবে ছাত্রছাত্রীরা স্বর্তস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছে দাবি করে ঢাবির ভিসি প্রফেসর ড. মো. আখতারুজ্জান বলেন, দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে। শিক্ষার্থীদের গণতন্ত্রের প্রতি প্রবল আস্থা দেশে আমি দারুণ খুশি। তবে হলগুলোতে ভোটের ব্যাপক অনিয়মের কথা স্বীকার করে চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা এস এম মাহফুজুর রহমান বলেছেন, আমি বিব্রত। জাল ভোট প্রদান, সিলযুক্ত ব্যাটল বাক্স উদ্ধারসহ যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে বিব্রতবোধ করছি। এসব ঘটনার জন্য হল প্রশাসনকে দায়ী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলো হল আগে থেকেই ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল। নির্বাচনী প্রচারণায় সেই নিয়ন্ত্রণ কিছুটা শীতিল হলেও ভোটের দিন সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। যারা ভোট নেন এবং যারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন প্রায় সবাই পক্ষপাতিত্ব আচরণ করেন। ভোটের দিন ব্যালট বাক্স হলে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পরও হঠাৎ করে আগের রাতে ব্যালট বাক্স হলে পাঠানোয় রাতেই নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয় প্রশ্ন ওঠে। বিশিষ্টজন, ডাকসুর কয়েকজন সাবেক ভিপি-জিএস এবং প্রার্থীদের অনেকেই আশঙ্কা করেন জাতীয় নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনের মতোই ডাকসু নির্বাচনেও আগের রাতেই ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ভরে রাখা হতে পারে। তারপরও ভোটাররা স্বর্তস্ফূর্তভাবে ভোট দেয়ার জন্য লাইলে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু লাইল আর এগোয় না। ভোট গ্রহণ শুরুর পর পরই অনিয়মের পরিস্থিতি টের পয়ে যায় শিক্ষার্থীরা। কুয়েত মৈত্রী হলে জাল ভোট দিয়ে ব্যালট বাক্স ভরে রাখা আবিস্কার করে ছাত্রীরা। ছাত্রলীগের প্রার্থীর নামের পার্শ্বে টিক দেয়া জালভোট ভর্তি ব্যালট বাক্সের বস্তা উদ্ধার করলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ভোট জালিয়াতির অভিযোগে শিক্ষার্থীরা প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ ও প্রক্টর ড. এ কে এম গোলাম রাব্বানী ও হল প্রভোস্ট শবনম জাহানকে অবরোধ করে রাখেন। ছাত্রছাত্রীরা ভোট গ্রহণ বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ করলে চাপের মুখে তাৎক্ষণিকভাবে হলের প্রোভোস্ট শবনম জাহানকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এক ঘন্টা স্থগিত থাকার পর পুনরায় শুরু হয়। সে সময়ই রোকেয়া হলেও একটি কক্ষে কয়েকটি ব্যালট বাক্স তালা মেরে রাখা হয়েছে দেখে ছাত্রীরা বিক্ষোভ চালানোর এক পর্যায়ে তালা ভেঙে কক্ষে প্রবেশ করে ব্যালট বাক্সগুলো উদ্ধার করে। সেখানে সিল মারা ব্যালটের সঙ্গে নতুন ব্যালট পেপারও পাওয়া যায়। বিক্ষুব্ধ ছাত্রীরা প্রো-ভিসির প্রাইভেটকারটি জালভোটের ব্যালট দিয়ে ঢেকে দেন।

ভোট জালিয়াতিকে তারা লজ্জার ভোট বলে শ্লোগান দেন। সেখানে ছাত্রলীগের মেয়েরা কোটা আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্রনেতা ভিপি প্রার্থী নুরুল হক নুরুকে মারধোর করে। এরপর একে একে সুফিয়া কামাল হল, সূর্যসেন হল থেকে আসতে থাকে নানা অভিযোগ। প্রার্থীদের অভিযোগের বাইরে অভিযোগ আসতে থাকে সাধারণ ভোটারদের কাছ থেকেও। সিল মারা ব্যালট, ব্যালট ভর্তি বাক্স, কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা ভোটারদের লম্বা লাইনসহ বিভিন্ন অভিযোগের মধ্যেই চলতে থাকে ভোটগ্রহণ। একইসঙ্গে একাধিক ভিপি প্রার্থীর ওপর ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগও আসে। দুপুরে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য সব দল ভোট বর্জনের ঘোষণা দিলে ক্যাম্পাস হয়ে ওঠে উত্তপ্ত। অভিযোগের সত্যতার এত প্রমাণ থাকার পরও ভোট বাতিল না করায় প্রশাসনের সমালোচনা করেন বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের বর্তমান নেতা ও প্রার্থীরা। তারা বলছেন, এই প্রহসনের নির্বাচন ছাত্রসমাজ মেনে নেবে না।

সকাল ৮টায় শুরু করে দুপুর ২টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণের সময় নির্ধারণ করা হলেও কারচুপির অভিযোগে ভোট বন্ধের পর পুনরায় শুরু করায় ২টার পরেও নির্বাচন চলতে থাকে কয়েকটি কেন্দ্রে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে প্রগতিশীল ছাত্রজোট, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ছাত্রঐক্য, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, স্বাধীকার স্বতন্ত্র পরিষদসহ নির্বাচনে অংশ নেয়া বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে কারচুপি, প্রার্থীদের উপর হামলা, ছাত্রলীগ ব্যতীত অন্য সংগঠনের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে না দেয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনে ভোট বর্জন করে লাগাতার ছাত্র ধর্মঘট ঘোষণা করে। এর পর বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে তারা তারা ভিসি বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। অন্যদিকে ছাত্রদল আলাদা সংবাদ সম্মেলন করে ভোট বর্জন ভিসি কার্যালয় ঘেরাও করে। নির্বাচনে অংশ নেয়া ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনসহ অন্যান্য সংগঠন থেকেও ভোট বর্জনের ঘোষণা আসতে থাকে। কারচুপি ও ভোট ডাকাতির দায় প্রশাসনের উল্লেখ করে নির্বাচন বাতিলের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষার্থীবৃন্দ’র ব্যানারে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে সাবেক শিক্ষার্থীরা। গতকাল বিকেল ৫টায় শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে এ প্রতিবাদ সমাবেশ করে তারা। এদিকে ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেছেন, আমি কয়েকটি হলে ঘুরে দেখেছি শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ করেছে।

কুয়েত মৈত্রী হলে বস্তাভর্তি ব্যালট
এদিকে ভোট গ্রহণের শুরুতেই ছাত্র হলগুলোতে ব্যালট বাক্স প্রার্থীদের না দেখানোয় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হলে প্রার্থীদের ফাঁকা ব্যালট বাক্স না দেখিয়ে ভোট শুরু করতে চাইলে বাধা দেই শিক্ষার্থীরা। ফলে ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ফাঁকা বাক্স দেখানো ছাড়া ভোট শুরু হতে দেয়নি তারা। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শিক্ষার্থীরা হলটিতে থেকে ছাত্রলীগের প্রার্থীদের নামের পাশে সিল মারা ৩ বস্তা ব্যালট উদ্ধার করে। এরপরেই হলটিতে প্রভোস্ট এর পদত্যাগ ও ছাত্রলীগের প্যানেলকে বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করতে থাকে ছাত্রীরা। শিক্ষার্থীরা এসময় কেন্দ্র পরিদর্শণ করতে আসলে প্রো-ভিসি ড. মো. সামাদকে ঘিরে ধরে। বিক্ষোভের মুখে হল প্রভোস্ট ড. শবনম জাহানকে অব্যাহতি দিয়ে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রফেসর মাহবুবা নাসরিনকে ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ড. মো.সামাদ হলটিতে অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান। এরপর সকাল ১১টায় কেন্দ্রটিতে আবার ভোট নেয়া শুরু করে প্রশাসন।

ফাঁকা ব্যালট বাক্স দফায় দফায় বিক্ষোভ
এদিকে সকাল থেকেই ফাঁকা ব্যালট বাক্স না দেখিয়ে ভোট গ্রহণ করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করতে থাকে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া ও সুফিয়া কামাল হলে। রোকেয়া হলে মোট ৯টি বাক্স এর মধ্যে প্রার্থীদের ৬টি বাক্স দেখানোর অভিযোগ আনে প্রার্থীরা। বাকি ৩টি বাক্স না দেখানোয় ভোট বর্জন করে হলের ভিতরেই বিক্ষোভ করতে থাকে ছাত্রীরা। শিক্ষার্থীরা ভোটগ্রহণ করার পাশের অন্য একটি তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে তালা ভেঙ্গে ৩টি ব্যালট বাক্স উদ্ধার করে। পরে স্টিলের বাক্স ভেঙ্গে তারা সেখান থেকে সিল না মারা ব্যালট বাক্স উদ্ধার করা হয়। প্রার্থীদের দাবি প্রশাসনের ছাত্রলীগের প্যানেলকে জিতানোর উদ্যোশে এসব ব্যালট আলাদা করে রাখা হয়, যাতে পরবর্তীতে সুবিধামত সময়ে ব্যালটগুলো দাগানো যায়। ১১টার পর থেকেই কেন্দ্রটিতে ভোটগ্রহণ স্থগিত হয়ে গেলেও দুপুর ২টায় আবার ভোটগ্রহণ শুরু করে প্রশাসন। তবে মাইকে ডেকে শিক্ষার্থীদের ভোট দেয়ার জন্য ডাকা হলেও এসময় কেন্দ্রে ভোটর উপস্থিতি ছিলো তুলনামূলক কম। এদিকে ফাঁকা ব্যালট বাক্স না দেখানোয় কয়েক দফায় ভোট স্থগিত হয় সুফিয়া কামাল হলে। ওই কেন্দ্রটিতে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে বিরোধী স্বতন্ত্র প্যানেল সুমা-মুনিরা প্যানেল ভোট বর্জন করে।

ভিপিপ্রার্থী নুরের উপর হামলা
রোকেয়া হলে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের খবর শুনে সেখানে গিয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর উপস্থিতিতে নারী কর্মীদের হামলার শিকার হয়েছে ভিপি প্রার্থী নুরুল হক নুর। তালাবদ্ধ কক্ষে ৩টি ব্যালট বাক্স গোপন রাখা হয়েছে ছাত্রীদের এমন অভিযোগের ভিত্তিতে সেখানে উপস্থিত হন তিনি। এসময় প্রথমে বাধা দিলেও বিক্ষোভের মুখে নুরুল হক নুর, ছাত্রদল থেকে জিএস প্রার্থী আনিসুর রহমান খন্দকার অনিকসহ ছাত্রলীগের শীর্ষ দু’নেতা সেখানে ঢুকেন। কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে আনিসুর রহমান খন্দকার ওই কক্ষে রাখা বাক্স ঘুলোতে কেন সিলগালা করা হয়নি এমন অভিযোগ করলে সামনে উপস্থিত ছাত্রলীগ প্যানেল থেকে ভিপি-জিএস প্রার্থীসহ হল শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা চিৎকার চেঁচামেচি করে উঠে। এসময় নুর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে চাইলে ছাত্রলীগের নারী কর্মীরা তাকে কিল, ঘুঁসি মারতে তাকেন এবং তার পাঞ্জাবি টেনে বারান্দার নিচে নামিয়ে দেন। এর একটু পরই নুর মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেলে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসা হয়।

কেন্দ্র ছিলো ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে
ভোট কেন্দ্রের ভিতরে হল প্রশাসন ও হাউজ টিউটররা ভোট গ্রহণ করলেও প্রবেশ পথ থেকে শুরু করে বাইরের লাইনগুলো ছিলো ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে। ফলে তারা নিজেদের কর্মী ও পরিচিত লোকজন ছাড়া আর কাউকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়নি। ছেলেদের হলগুলোর সবগুলোতেই ছিলো ভোটারদের কৃত্তিম দীর্ঘ লাইন। ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরুর কথা থাকলেও ভোর ৬টা থেকেই কেন্দ্রের প্রবেশ পথ ও লাইনের নিয়ন্ত্রণ নেয় ছাত্রলীগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, মাস্টার’দা সূর্যসেন হল, বিজয় একাত্তর হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, জাতির জনক শেখ মুজিবর রহমান হল, কবি জসীমউদ্দীন থেকে শুরু করে সাইন্সের ছাত্রদের হলগুলোতেও ছিলো একই অবস্থা। ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রীত গণরুমে থাকা ১ম ও ২য় বর্ষের শিক্ষার্থীদের এসব লাইনে ভোর থেকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। একবার ভোট দেয়া শেষ হয়ে যাওয়ার পর আবারও তাদের লাইনে দাঁড়াতে দেখা যায়। বিরোধী প্রার্থীদের দাবি ছাত্রলীগ দীর্ঘ লাইন করে রেখে বাইরের ভোটারদের সামনে আসতে দেয়নি। ফলে ভোট দিতে আসা অনেক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়ানোর পর ধৈয্য হারা হয়ে চলে যেতে দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে সকাল থেকেই প্রবেশ মুখ ও লাইনের নিয়ন্ত্রর নেন হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সরকার রায়হান জহির, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সানীসহ ছাত্রলীগ প্যানেল থেকে নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রার্থীরা। ছাত্রলীগের বাধার মুখে শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রে ডুকতে পারছেন না এমন সংবাদের ভিত্তিতে হল প্রশাসনের সাথে কথা বলতে কেন্দ্রে আসেন বাম ছাত্রজোট থেকে ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী। হল প্রভোস্ট প্রফেসর ড. মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া ও হল রিটার্নিং অফিসার প্রফেসর ড. মো. আবুল কালাম আজাদের সাথে কথা বলতে লাগলে কেন্দ্রের ভিতরই গালিগালাজ করে তেড়ে আসেন হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সানী।

এসময় তিনি প্রায় ৫০জন নেতাকর্মী নিয়ে লিটন নন্দীকে ধাওয়া দেন। পরে এ ভিপি প্রার্থী প্রভোস্ট এর সহযোগিতায় হল থেকে বেরিয়ে আসেন। ভোট দিতে গিয়ে হামলার শিকার হন ছাত্রদলের সূর্যসেন হল শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক শামীম আক্তার শুভ। বেলা ১২টার দিকে সূর্যসেন হলে ছাত্রলীগকর্মী শাহ আলম, তাকি ও রাতুলের নেতৃত্বে তার উপর হামলা চালানো হয়। পরে তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।
প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তাকে ঘেরাও
নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রফেসর এস এম মাহফুজুর রহমানকে ঘেরাও করার ঘটনা ঘটেছে।

দুপুরে ভোট বর্জন করে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল চলাকালে রোকেয়া হলের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এর কিছুক্ষণ আগে রোকেয়া হলে ভোট স্থগিতের খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান। এসময় প্রার্থী ও সমর্থকরা তাকে ঘিরে পেলে। পরে সেখান থেকে রেজিস্টার বিল্ডিং এ নিয়ে আসা হয়।
নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করতে ষড়যন্ত্র হচ্ছে ঃ ছাত্রলীগ
এদিকে ভোট কারচুপি ও হামলার ঘটনা অস্বীকার করে ডাকসু নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল ষড়যন্ত্র করছে বলে মন্তব্য করেছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ডাকসুতে ভিপি প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। বিকেলে মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রলীগ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। শোভন বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোকেয়া হলে কেন্দ্রের ভেতরে নুরুল হক নুর ও মুহসীন হলে লিটন নন্দীকে মারধরের ঘটনা ভিত্তিহীন। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জিএস প্রার্থী গোলাম রাব্বানী বলেন, সুন্দর পরিবেশে বাম সংগঠনসহ ছাত্রদলের বিভিন্ন নেতারা যে তাণ্ডব চালিয়েছে তার নিন্দা জানাই। এসময় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন প্রমুখ।