জাতীয় দলের ক্রিকেটার মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন তার স্ত্রী সামিয়া শারমিন। ময়মনসিংহের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যৌতুক নিরোধ আইন ৩ ও ৪ ধারায় অভিযোগ করেন তিনি। এ বিষয়ে সদর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন আদালত। তবে, অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সৈকত।

জানা গেছে, ২০১২ সালে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের সাথে তার আপন খালাতো বোন সামিয়া শারমিনের বিয়ে হয়। অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলার কারণ দেখিয়ে দীর্ঘদিন বিয়ের কথা গোপন রেখেছিলেন সৈকত।

সৈকতের স্ত্রীর বড় ভাই মোজাম্মেল কবির জানান, সৈকত আমার খালাতো ভাই। তাদের পারিবারিক অবস্থা এক সময় খুব খারাপ ছিল। সে আমাদের বাসায় আসা-যাওয়া করতো। তখন আমার বোনের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক হয়। আমরা বোনের বিয়ের জন্য পাত্র ঠিক করি, সৈকত তখন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের খেলোয়াড়। সৈকত তখন আত্মহত্যার হুমকি দেয়। ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে। একসময় আমরা তাদের বিয়ে দেই।

তিনি জানান, সৈকত আমাদের বলেছে সে বয়স লুকিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলছে। তাই বিয়ের ব্যাপারটা গোপন রাখতে চায়। আমরা এটি নিয়ে আর হৈচৈ করিনি। একসময় মাশরাফী, খালেদ মাহমুদ সুজন ভাই তারা তার বিয়ের কথা জানতে পারে। সৈকতের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন দেখে তারা তার স্ত্রীকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। কিন্তু সে বউ নিয়ে যায়নি। ব্যাচেলর পরিচয়ে বাসা নেয়। বিভিন্ন মেয়েরা সেখানে আসা যাওয়া করে। বন্ধুদের নিয়ে মদ্যপান আসর বসায়। এগুলো আমার বোন জানতে পারলে তাকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করে। তখন তার ওপর নির্যাতন নেমে আসে।

বিষয়টি নানাভাবে মীমাংসা করার চেষ্টা করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, কিছুদিন পরপরই আবার ঝামেলা শুরু হয়। বিষয়টি জানতে পেরে খালেদ মাহমুদ সুজন ভাই আমাদের বলেন যে, সৈকত ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর শেষ করে আসলে ১৫ আগস্ট আমরা বিষয়টি নিয়ে বসবো। মীমাংসার চেষ্টা করবো। সৈকত দেশে ফিরে ময়মনসিংহ এসে ১৪ আগস্ট আমার বোনকে ঢাকায় সুজন ভাইয়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে যায়। তারপর তাকে মারধর করে। একসময় তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়। খবর পেয়ে আমি আমার ছোট ভাইকে পাঠিয়ে তাকে বাড়ি নিয়ে যায়। সৈকত পুলিশ দিয়ে ফোন করিয়ে আমাকে হুমকি দিতে থাকে। এসআই ফারুক পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি আমাকে ক্রমাগত হুমকি দিকে থাকেন। বাধ্য হয়ে আমরা নারী নির্যাতন মামলা করেছি তার বিরুদ্ধে। আমাদের চাওয়া ক্রিকেট যেন আর কলঙ্কিত না হয়। একে একে খেলোয়াড়দের এসব ঘটনায় আমাদের টিমের ইমেজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা তার সর্বোচ্চ সাজা চাই।

সৈকতের স্ত্রী সামিয়া শারমিন যমুনা অনলাইনকে বলেন, সৈকতের দুর্দিনে আমি তার পাশে ছিলাম। তার অর্থ-খ্যাতি হওয়ার পর সে আমার সাথে বাজে ব্যবহার শুরু করে। মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি শাররীক নির্যাতনও শুরু করে। এপ্রিলে আমি কনসিভ করি। রোজার ঈদের আগে আমার বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে যায়। ঈদে সৈকত বাড়ি আসে। আমি তাদের বাসায় ছিলাম। তার মা আমাকে বললো, বাপের বাড়ি চলে যেতে কারণ আমার সেভাবে যত্ন হচ্ছিল না সেখানে। দু’মাস ধরে আমি বাসায়। তারা আমার সাথে কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি।

বিষয়টি মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা ও খালেদ মাহমুদ সুজনকে জানান উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুজন ভাই বললেন, তুমি সৈকতকে নিয়ে আমার বাসায় আসো। আমি বসে বিষয়টি মিউচুয়াল করে দেই। ১৫ তারিখ সুজন ভাইয়ের বাসায় যাওয়ার কথা বলে সৈকত ১৪ তারিখ রাতে আমাকে তার বাসায় ডেকে নেয়। কিন্তু ওর বাসায় যাওয়ার পর সে আমার ফোন ভেঙে ফেলে। তারপর আমাকে মারধর করে। তার বাসার জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। আমাকে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বলে। খবর পেয়ে আমার ভাই গিয়ে আমাকে নিয়ে আসে। সেদিনই সে যৌতুকের টাকা দাবি করে।

অনেকভাবে সৈকতের সাথে সংসার টেকানোর চেষ্টা করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আমাকে এখন তার ভালো লাগে না। বিভিন্ন মেয়েদের সাথে রিলেশন করতেছে। ফ্ল্যাট নিয়ে ঢাকায় আলাদা থাকছে। আমার কথা সে কাউকে জানায় না। আমার মতো আরেকটা মেয়ের জীবন যেন নষ্ট না হয়। আমি ওর শাস্তি চাচ্ছি।

এ বিষয়ে ক্রিকেটার মোসাদ্দেক সৈকতের সাথে কথা হয় যমুনা অনলাইনের। সব অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমি জানতে পেরেছি তার যৌতুকের একটা মামলা করেছে। তারাই বলতে পারবে এটা কতটুকু সত্য বা মিথ্যা। আমি মনে করি যে এত খারাপ সময় আমার আসেনি যে যৌতুক নিয়ে আমার চলতে হবে। আমি শুনেছি যে ডিভোর্স দিলে নাকি এমন নারী নির্যাতন বা যৌতুকের একটা মামলা করা হয়। তারাও হয়তো তাই করেছে।

গত ১৬ আগস্ট তার স্ত্রীকে ডিভোর্স লেটার পাঠানোর কথা জানিয়ে সৈকত বলেন, আমার এত সমস্যা থাকলে তারা তো ডিভোর্সের আগে এই অভিযোগ করতে পারতো। ডিভোর্সের পরে কেনো এসব অভিযোগ করছেন তারা।

ডিভোর্সের কারণ হিসেবে সৈকত জানান, সে আমার সাথে থাকতে পারছিল না। আমার মায়ের সাথে বাজে ব্যবহার করতো। সত্য কথা বলি, সে আমার মায়ের গায়ে হাত তুলেছিল সে কারণেই ডিভোর্স দিয়েছি তাকে। যখন কারো মায়ের গায়ে হাত তোলা হয় সে কীভাবে চুপ করে থাকবে?

এ ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি। জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে একের পর এক নারী নির্যাতনের অভিযোগ উঠতে থাকায় বোর্ডের নির্লিপ্ততাকে দায়ী করছেন অনেকে। এর আগে, রুবেল হোসেন, নাসির হোসেন, আরাফাত সানি, সাব্বির রহমান, মোহাম্মদ শহীদের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল। এবার সে তালিকায় কদর্য তালিকায় যুক্ত হলো প্রতিশ্রুতিশীল অলরাউন্ডার মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের নাম।

সূত্র :- যমুনা নিউজ